,

শিরোনাম :
«» সিলেট বিভাগের ১৯ টি সংসদীয় আসনে ভোটার সংখ্যা ৮ লাখ ৪০ হাজার «» তারেক রহমানের ভিডিও কনফারেন্সের ব্যাপারে আইন পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে ইসি «» থার্টিফার্স্টে কোনো অনুষ্ঠান নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী «» বাসস ব্যবস্থাপনা সম্পাদক শাহরিয়ার শহীদের মৃত্যুতে পরিকল্পনা মন্ত্রীর শোক «» আগামী বছর থেকে পিএসসির পরিবর্তে শুধু জেএসসি পরীক্ষা হতে পারে : সমাজকল্যাণ মন্ত্রী «» আমন মৌসুমে ৬ লাখ মে.টন চাল কিনবে সরকার «» মির্জা আব্বাস দম্পতির আগাম জামিন «» তারেকের ভিডিও কনফারেন্স নিয়ে ইসির দৃষ্টি আকর্ষণ ওবায়দুল কাদেরের «» বিনা বেতনে বিশ্বকাপে পাকিস্তানি মেয়েরা «» মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলায় সিরিয়ায় নিহত ৪০

কৃষিবান্ধব বাজেট ও প্রত্যাশিত সমৃদ্ধি

সরকারি অর্থের মালিক মূলত জনগণ। সুতরাং সুচারুভাবে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশের জনসাধারণ কীভাবে সর্বোচ্চ সুবিধা পেতে পারেন, বাজেটে সে সম্পর্কে দিক-নির্দেশনা থাকে। তাই সরকারের বার্ষিক বাজেট রাষ্ট্রের উন্নয়ন দর্শনের অন্যতম পথ নিদের্শক দলিল।
সরকারের এক দশকের নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও বর্তমান সরকারের হাতে নেওয়া বিভিন্ন মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবারের (২০১৮-১৯ অর্থবছরে) প্রস্তাবিত বাজেটে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বাড়ানো, স্থানীয় শিল্পে প্রণোদনা, কৃষি ও জ্বালানি খাতে বিশেষ অগ্রাধিকার, শিক্ষা ও তথ্যপ্রযুক্তিতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে গড়ার অঙ্গীকার রয়েছে এই বাজেটে। গরিব ও হতদরিদ্র ১১ লক্ষ মানুষকে সোশ্যাল সেফটি নেট-এর আওতায় আনার উদ্যোগে পিছিয়েপড়া জনসাধারণকে এগিয়ে নিতে বিশেষ সুবিধা থাকছে এই বাজেটে।
বিগত ১০ বছর বর্তমান সরকার অর্থনৈতিক দিক থেকে যে সাফল্য অর্জন করেছে তার কিছু তথ্য এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে। ১. বাজেটের আয়তন ২০০৯-১০ অর্থবছরে ৮৯ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকায়; ২. মাথাপিছু আয় ২০০৯-১০ অর্থবছরে ৭৫৯ মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৫২ মার্কিন ডলার; ৩. দেশে মূল্যস্ফীতি ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ৭.১৬ শতাংশ থেকে কমে বর্তমান অর্থবছরে হয়েছে ৫.৮ শতাংশে; ৪. গত এক দশকে আমাদের গড় প্রবৃদ্ধির হার ৬.৭৫ শতাংশ, যেখানে উন্নয়নশীল দেশের গড় প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে; ৫. বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (ADP) ২০০৯-১০ অর্থবছরে ৩০,৫০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ১,৭৩,০০০ কোটি টাকা; ৬. সরকারি বিনিয়োগ বেড়েছে ৪.৩ শতাংশ থেকে ৮.২ শতাংশে; ৭. বার্ষিক রপ্তানি ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ১০.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বর্তমানে ৩৪.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে; ৮. বার্ষিক আমদানি ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ১১.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭.০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে; ৯. বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ৩.৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে; ১০. দেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর হার নেমেছে ২০০৫ সনে ৪০ শতাংশ থেকে ২০১৭ সনে ২২.৩ শতাংশে এবং একই সময়ে হতদরিদ্রের হার কমেছে ১৭.৬ শতাংশ থেকে ১১.৩ শতাংশে;
এসব তথ্যাদি প্রমাণ করে আমাদের অর্থনীতির সমপ্রসারণ ঘটেছে অভূতপূর্বভাবে।
এবারের প্রস্তাবিত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাজেটকে মোটা দাগে বিনিয়োগ ও ব্যবসা বান্ধব বাজেট বলা যায়। স্থানীয় বিনিয়োগ বিশেষ করে মোটর সাইকেল ও মোবাইল সেট উত্পাদনের ভ্যাট অব্যাহতি উদ্যোগগুলো ইতিবাচক। বর্তমান সরকার সামাজিক সুরক্ষা খাতকে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে উপকারভোগীদের ভাতা বাড়ানোর যে প্রস্তাব বাজেটে করা হয়েছে সেটা অত্যন্ত প্রশংসনীয়, বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬৪,৬৬৫ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১৩.৯২ শতাংশ এবং মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) ২.৫৫ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেটে অসচ্ছল, যুদ্ধাহত ও অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধা বা তাদের স্ত্রী, পুত্র ও কন্যা অথবা নাতি-নাতনিদের সহায়তার জন্য ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া বয়স্ক, প্রতিবন্ধী, বিধবা, হিজড়া, বেদে, অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
চলতি বছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭.৮ শতাংশ। ২০২০ সালে এটাকে ৮ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হবে। আমাদের ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় জিডিপির গড় প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭.৪ শতাংশ। এ বাজেটের মধ্য দিয়ে ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে।
আমরা জানি, বিদ্যুত্ খাতে গত অর্থবছরে বরাদ্দ যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে এ খাতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে বিদ্যুত্ উত্পাদন ২০২১ সালের মধ্যে ২৪ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত হবে। আগামী অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৪ হাজার ৯২০ কোটি টাকা। কৃষিখাতের রূপান্তর ও বাজেট বরাদ্দের চুম্বক অংশ দেখে নেওয়া যাক। মোট দেশজ উত্পাদন তথা জিডিপিতে কৃষিখাতের অবদান ১৪.১০%। জিডিপি’তে কাঙ্খিতভাবেই কৃষি খাতে অবদান কমেছে, শিল্প ও সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। কিন্তু এখনো বাংলাদেশের শতকরা প্রায় ৬০ ভাগ মানুষের জীবন-জীবিকা কোনো না কোনোভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল।
আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের (২০১৪) অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল সার, বীজ, সেচসহ কৃষি উপকরণে ভর্তুকি প্রদানের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা ও বিশ্বে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করবার তাগিদেই বাংলাদেশের কৃষিতে ভর্তুকির প্রয়োজন রয়েছে। সরকার বেশ ক’বছর যাবত্ বাজেটে কৃষি ভর্তুকি অন্তর্ভুক্ত করছে। কিন্তু জাতীয় বাজেটের আকার ক্রমশ বৃদ্ধি পেলেও বিগত কয়েক বছর ধরে এই ভর্তুকির পরিমাণ ৯,০০০ কোটি টাকায় স্থির রয়েছে এবং জাতীয় বাজেটে এর অংশীদারিত্ব ক্রমহ্রাসমান।
জাতীয় কৃষি নীতি ও সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কৃষির বাণিজ্যিকীকরণকে মূল বিবেচনায় রাখা হয়েছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কৃষিতে বিনিয়োগ পরিকল্পনায় ২০১৬-১৭ এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন বরাদ্দ ধরা হয় যথাক্রমে ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ও ২ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা। কিন্তু উন্নয়ন বাজেটে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশোধিত বাজেট বরাদ্দ ছিল প্রায় ১ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা আর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা। সুতরাং অন্তত বিনিয়োগের দিক দিয়ে জাতীয় উন্নয়ন দলিল সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে তা বলা কঠিন। এ পরিকল্পনায় কৃষির বাণিজ্যিকীকরণের উপর জোর দেওয়া হয়েছিল, যা খামারভিত্তিক চাষাবাদকে উত্সাহিত করেছে।
বাজেট গত এক দশকে সবচেয়ে বেশি হারে বেড়েছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে (১৮% হারে প্রতি বাজেটে), ১৩.৫ % হারে শিক্ষা ও তথ্য প্রযুক্তি খাতে, তৃতীয় স্থানে রয়েছে বিদ্যুত্ ও জ্বালানি খাতে (১৩% প্রতি বাজেটে) এবং সবচেয়ে কম হারে বৃদ্ধি পেয়েছে কৃষি খাতে ৭.৬% হারে।
আমাদের মাথাপিছু আয় ও দেশজ প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় দেশজ আয় বেড়েছে ৬.৩ শতাংশ হারে আর সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় গত তিন বছরে বেড়েছে ৭.২ শতাংশ হারে, মূল্যস্ফীতি বাদ দিয়ে শিক্ষা ও তথ্য প্রযুক্তিখাতে জিডিপি বৃদ্ধির চেয়েও ব্যয় বেড়েছে মাত্র ০.৬৩ শতাংশ হারে, পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে ১ শতাংশ হারে, স্বাস্থ্য খাতে ০.৩৫ শতাংশ, প্রতিরক্ষায় ০.৩৯ শতাংশ, জ্বালানি ও বিদ্যুতে ০.২৮ শতাংশ এবং কৃষিতে ০.২৭ শতাংশ হারে। জিডিপি বৃদ্ধির তুলনায় কৃষিতে ব্যয় বৃদ্ধির হার সর্বনিম্ন।
ভর্তুকি প্রদান করে কৃষি খাতকে সমর্থন দেওয়া হয়ে থাকে। কৃষিতে ভর্তুকির পরিমাণ গত পাঁচ বছর ৯,০০০ কোটি টাকায় সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। গত পাঁচ বছর মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির গড় হার ছিল ৫.৮৮ শতাংশ। অর্থাত্ প্রতিবছর ঐ ভর্তুকির প্রকৃত মূল্য ক্রমান্বয়ে কমেছে ৫.৮৮ শতাংশ হারে। এই ৯,০০০ কোটি টাকা গত পাঁচ বছর প্রায় ৩০ শতাংশ মূল্য হারিয়েছে। তথ্য-উপাত্ত এটাই নির্দেশ করে যে, কৃষিতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়েনি।
আয় বৈষম্য কমাতে কৃষির ভূমিকা আবির্ভূত এক চ্যালেঞ্জ। ২০০১ সালে দেশের মানুষের মাথাপিছু মাসিক গড় আয় ছিল মাত্র ৪৩০ ডলার। বর্তমানে মাথাপিছু আয় ১৭৫২ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। বিবিএস এর তথ্য উপাত্ত অনুযায়ী ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭.৬৫ শতাংশ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয় বাড়লেও দেশে ধনী-গরিব বৈষম্য বেড়েছে। গরিব শ্রেণির কাছে প্রবৃদ্ধির সুফল কম পৌঁছাচ্ছে।
বৈষম্য কমাতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয় বাড়াতে হবে। আর বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচনে কৃষিখাত সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে। আন্তর্জাতিক সমীক্ষা থেকে দেখা যায়, কৃষির উত্পাদন ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে দারিদ্র্যের হার ০.৫ শতাংশ হ্রাস পায়। অর্থনীতির অন্যান্য খাতের চেয়ে দারিদ্র্য মোচনে কৃষিখাতের উত্পাদন বৃদ্ধির প্রভাবই বেশি। কারণ তাতে জনপ্রতি খাদ্যশস্যের প্রাপ্যতা বাড়ে, খাদ্যশস্যের মূল্যে স্থিতিশীলতা বিরাজমান থাকায় তাতে সাধারণ মানুষের ক্রয় অভিগম্যতা বৃদ্ধি পায়। এসডিজিতে ২০৩০ সালের মধ্যে কৃষিপ্রতি একরে উত্পাদন দ্বিগুণ করার কথা বলা হয়েছে। আমরা সে লক্ষ্য অর্জনে কীভাবে এগোব সে প্রস্তাবনা বাজেটে প্রতিফলিত তেমন হয়নি। মূলত এসডিজি বাস্তবায়নে কি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে বাজেটে সেটা স্পষ্ট নয়।

 

টেকসই কৃষি উন্নয়নের একটি প্রধান লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধা নির্মূল করা এবং সবার জন্য খাদ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা। বিশেষ করে দরিদ্র মানুষের জন্য খাদ্য ও পুষ্টির সরবরাহ নিশ্চিত করা টেকসই কৃষি উন্নয়নের আর একটি প্রধান লক্ষ্য। বৈরী আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর মতো কৃষি উত্পাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থার প্রবর্তন করা এর অপর একটি লক্ষ্য। কৃষি রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে কেননা ইদানীং কৃষিতে আমাদের রপ্তানি আয় কমছে। আমাদের বোধগম্য নয়, রপ্তানি উন্নয়নে আমরা এখনো কেন একটি দেশের সঙ্গেও ‘মুক্তবাণিজ্য’ চুক্তি করতে পারলাম না। ভিয়েতনামের এই পর্যন্ত ২০টির অধিক দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে। আর বৃহত্ ট্রান্স-প্যাসিফিক বাণিজ্য জোটের অন্তর্ভুক্তও হয়েছে ভিয়েতনাম। তাদের রপ্তানি আয় আমাদের ৬ গুণের বেশি।
আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ দেশের খাদ্য উত্পাদন দ্বিগুণ করার জন্য গত ২৫ বছরে আমরা যা করেছি, আগামী ১৫ বছরে তা সম্ভব করে দেখাতে হবে। আর এটা করা হলো আমাদের জন্য একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। এর জন্য বাংলাদেশে কৃষির উত্পাদন প্রতি বছর শতকরা ৪ থেকে সাড়ে ৪ ভাগ হারে বাড়িয়ে যেতে হবে, অথচ বাড়ছে গড়ে ৩ শতাংশ হারে। কৃষির বিভিন্ন উপখাতে ক্রমাগতই উত্পাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু খাদ্য নিরাপত্তা ও সবার জন্য খাদ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি তা টেকসই করতে হলে ফসল খাতে প্রবৃদ্ধির হার আরো বাড়াতে হবে। আমাদের কৃষিজমি, পানি এবং কারিগরি জ্ঞান ও মেধাশক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে কাঙ্ক্ষিত হারে কৃষি উত্পাদন বৃদ্ধি করতে হবে। তবে কৃষিকাজ এখন অপেক্ষাকৃত কম লাভজনক। ফলে কৃষির উত্পাদন বৃদ্ধিতে কৃষকের আগ্রহ দিন দিন কমে যাচ্ছে। তাদেরকে অধিকতর আগ্রহী করে তোলার জন্য কৃষিখাতে প্রণোদনা দেওয়া দরকার। আর এই জন্যই বাজেটে কৃষিখাতে বরাদ্দ ও ভর্তুকির পরিমাণ বাড়ানো দরকার, টেকসই কৃষি উন্নয়ন কার্যক্রমকে চিহ্নিত করা দরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের খাত হিসেবে। সরকারকে শুধু কৃষি উত্পাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিলেই চলবে না, কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ভর্তুকির পরিমাণ, মূল্যস্ফীতিকে বিবেচনায় নিয়ে নির্ধারণ করতে হবে।
কৃষকের চাহিদা ও বাজার চাহিদা ভিত্তিক সিস্টেম-বেজ্ড এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় কীট পতঙ্গ/রোগবালাই মুক্তি, খরা/লবণাক্ততা সহিষ্ণু, আবহাওয়া ও পরিবেশ উপযোগী এবং স্বল্প সময়ে ফসল পাওয়া যায় এরূপ শস্যের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে ও সমপ্রসারণসহ সার্বিক কৃষি গবেষণাকে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন, জমি কমে যাওয়া, উর্বরতা হ্রাস পাওয়াসহ নানা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে কৃষি খাত। তাই দেশের কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য জাতীয় বাজেটে কৃষি গবেষণা ও নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে ব্যাপক অর্থ বরাদ্দ বাড়ানো দরকার। আর বরাদ্দকৃত এ অর্থ যাতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শস্য ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে ব্যয় করা হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় অন্তত দেশজ আয়ের ১ শতাংশ ব্যয় বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন, যা বর্তমানে আছে ০.৫ শতাংশ। কৃষি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে অবদান রাখতে পেরেছে-এমন বিজ্ঞানীদের চাকরিতে প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
আমাদের আশাবাদ ২০১৮-১৯ অর্থবছরের এই বাজেট হবে আরো কৃষিবান্ধব, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশিত ও বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাবার আরো পথ একটি নির্দেশনা।
লেখক : কৃষি অর্থনীতিবিদ ও সদস্য (সিনিয়র সচিব), সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ, বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন
Share
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত : সিএনআই২৪ ডটকম লিমিটেড || Desing & Developed BY Themesbazar.com