বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও জ্বালানি দক্ষতা বাড়াতে এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থাকে বেগবান করতে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (বাইডেক)-এর মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার ঢাকার উত্তরাস্থ বিজিএমইএ কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিজিএমইএ’র পক্ষে সহ-সভাপতি ভিদিয়া অমৃত খান এবং বাইডেক’র পক্ষে প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মোহাম্মদ ইব্রাহিম এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন।
অনুষ্ঠানে বিজিএমইএ’র পরিচালক শাহ রাইদ চৌধুরী, এনার্জি অপটিমাইজেশন কমিটির অ্যাডভাইজর এবং ডিকার্বনাইজেশন কমিটির কো-চেয়ার কামরান সাদিক, সাসটেইনেবল এনার্জি কমিটির চেয়ারম্যান সাইফুর রহমান, এনার্জি অপটিমাইজেশন কমিটির চেয়ারম্যান নিশাত হামিদ এবং বাইডেক’র প্রধান ব্যবসা উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. মুয়িদ হাসান উপস্থিত ছিলেন।
এই সমঝোতা স্মারকের মূল উদ্দেশ্য হলো, শিল্পকারখানায় বহুল ব্যবহৃত পুরনো ও অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী ক্যাপাসিটর-টাইপ সিলিং ফ্যানগুলোকে ফেলে না দিয়ে বাইডেক’র উদ্ভাবিত ও পেটেন্টকৃত ‘মাইক্রো সাসটেইনেবল আপসাইক্লিং’ প্রযুক্তির সাহায্যে সর্বাধুনিক বিএলডিসি ফ্যানে রূপান্তর করা। এর ফলে ফ্যান প্রতি প্রায় ৪০% থেকে ৬০% পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার হ্রাস পাবে।
সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পূর্বে বিজিএমইএ’র তদারকিতে ৪২টিরও বেশি সদস্য কারখানায় এই প্রযুক্তির ওপর বিস্তারিত ফিল্ড ট্রায়াল চালানো হয়। ট্রায়ালের ফলাফলে দেখা যায়, ফ্যানের আপসাইক্লিং করার পর কারখানায় ৪৭% থেকে প্রায় ৬৫% পর্যন্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব হচ্ছে।
সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি ভিদিয়া বলেন, ‘দেশীয় তরুণ উদ্যোক্তা ও স্থানীয় উদ্ভাবন যে আমাদের শিল্প খাতের বড় বড় চ্যালেঞ্জের কার্যকর সমাধান দিতে পারে, এই উদ্যোগ তারই উৎকৃষ্ট প্রমাণ। ৪২টি কারখানায় প্রাপ্ত সফলতা নিশ্চিত করেছে যে, এই আপসাইক্লিং প্রযুক্তি বিজিএমইএ সদস্যদের জন্য পরিচালন ও বিদ্যুৎ খরচ কমানোর এক বড় সুযোগ। এটি কেবল আমাদের কারখানার ডিকার্বনাইজেশন ও টেকসই উন্নয়ন যাত্রাকে দ্রুত করবে না, বরং বৈশ্বিক বাজারের প্রতিযোগিতায় ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে।’
এই সমঝোতার মাধ্যমে বিজিএমইএ’র সদস্য কারখানাগুলো বাইডেক’র কাছ থেকে বিশেষ ছাড়ের সুবিধা এবং বিজিএমইএ থেকে সরবরাহকৃত ‘ওয়ান-টাইম ইউনিক কোড’ ব্যবহারের সুযোগ পাবে। পাশাপাশি প্রতিটি আপসাইকেল করা ফ্যানে ৫ বছরের আফটার-সেলস গ্যারান্টি প্রদান করা হবে। বিদ্যুৎ ব্যবহারের হার ও পরিচালন সময়ভেদে এই প্রযুক্তিতে কারখানাগুলোর বিনিয়োগ দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে উঠে আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
শিল্পখাতে ডিকার্বনাইজেশনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বিজিএমইএ’র পরিচালক শাহ রাইদ চৌধুরী বলেন, ‘বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও জ্বালানি দক্ষতা বজায় রাখা এখন আর শুধু পরিবেশ রক্ষায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি ব্যবসায় টিকে থাকা ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার প্রধান শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের স্থানীয় কোনো প্রযুক্তি যদি প্রায় ৫০% এর বেশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয় করে দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে খরচের অর্থ ফিরিয়ে আনে, তবে তা উদ্যোক্তাদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষনীয় একটি সমাধান। দেশজুড়ে অসংখ্য কারখানায় এটি বাস্তবায়িত হলে তা আমাদের জাতীয় পাওয়ার গ্রিডের ওপর চাপ কমাতেও কার্যকর অবদান রাখবে।’
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের আসন্ন কঠোর পরিবেশ ও সাপ্লাই চেইন ডিউ ডিলিজেন্স নীতিমালা সফলভাবে বাস্তবায়নে এই উদ্যোগ এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই কৌশলগত অংশীদারিত্ব কারখানার পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উৎপাদনের চাহিদা পূরণ করবে। একই সঙ্গে, শিল্পখাতে বিদ্যুতের অপচয় কমিয়ে এটি জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার ও দেশের সবুজ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে।