যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইউক্রেন ও রাশিয়ার প্রতিনিধিরা বুধবার জেনেভায় দ্বিতীয় দফা শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করার কথা রয়েছে, তবে ইউরোপের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে প্রাণঘাতী এই সংঘাত অবসানের বিষয়ে কোনো পক্ষই অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়নি।
যুদ্ধ বন্ধে এটি সর্বশেষ কূটনৈতিক উদ্যোগ। প্রায় চার বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে কয়েক লাখ মানুষ নিহত হয়েছে, লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং ইউক্রেনের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধের অবসান চেয়ে আসছে, কিন্তু ভূখণ্ড প্রশ্নে মস্কো ও কিয়েভের মধ্যে সমঝোতা করাতে ব্যর্থ হয়েছে। এর আগে আবুধাবিতে দুই দফা আলোচনা হলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি।
জেনেভা থেকে এএফপি রুশ প্রতিনিধিদলের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানায়, সর্বশেষ আলোচনা ‘খুবই উত্তেজনাপূর্ণ’ ছিল এবং ছয় ঘণ্টা স্থায়ী হওয়ার পর তা শেষ হয়েছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সন্ধ্যাকালীন ভাষণে বলেন, তিনি যুদ্ধের অবসানে ‘সম্মানজনক চুক্তির দিকে দ্রুত এগোতে’ প্রস্তুত, তবে রাশিয়া শান্তি বিষয়ে আন্তরিক কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
তিনি বলেন, ‘তারা আসলে কী চায়?’ এবং অভিযোগ করেন, রাশিয়া ‘বাস্তব কূটনীতি’র বদলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
রাশিয়া ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু করে, যার ফলে বহু শহর ধ্বংস হয়ে যায়।
জেলেনস্কি বারবার বলেছেন, ইউক্রেনকে রাশিয়ার তুলনায় অসম মাত্রার ছাড় দিতে বলা হচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার ইউক্রেনের ওপর দ্রুত চুক্তিতে পৌঁছানোর চাপ সৃষ্টি করে বলেন, তাদের ‘দ্রুত আলোচনার টেবিলে আসা উচিত’।
জেলেনস্কি মঙ্গলবার অ্যাক্সিওসকে বলেন, ট্রাম্পের এ ধরনের আহ্বান ‘ন্যায্য নয়’ এবং রাশিয়াকে ‘জয়’ উপহার দিলে স্থায়ী শান্তি আসবে না।
বর্তমানে রাশিয়া ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ভূখণ্ড দখলে রেখেছে, যার মধ্যে ২০১৪ সালে দখল করা ক্রিমিয়া উপদ্বীপও রয়েছে। সম্ভাব্য চুক্তির অংশ হিসেবে মস্কো দোনেৎস্ক অঞ্চলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দাবি করছে এবং আলোচনা ব্যর্থ হলে তা বলপ্রয়োগে নেওয়ার হুমকি দিয়েছে।
কিয়েভ এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ছাড়া কোনো চুক্তিতে স্বাক্ষর করবে না বলে জানিয়েছে।
রাশিয়া ধীরে ধীরে ফ্রন্টলাইনে অগ্রগতি অর্জন করলেও তাদের যুদ্ধকালীন অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে; প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে পড়েছে এবং তেলের আয় কমে যাওয়ায় বাজেট ঘাটতি বেড়েছে।
এএফপির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত সপ্তাহে ইউক্রেনীয় বাহিনী প্রায় আড়াই বছরের মধ্যে দ্রুততম অগ্রগতি অর্জন করে ২০১ বর্গকিলোমিটার এলাকা পুনর্দখল করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার স্টারলিংক ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় এই পাল্টা আক্রমণ সহজ হয়েছে।
জেনেভার আলোচনায় রাশিয়ার প্রধান আলোচক হিসেবে পুনরায় দায়িত্ব পেয়েছেন সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী ভøাদিমির মেদিনস্কি, আর ইউক্রেনের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন জাতীয় নিরাপত্তা সচিব রুস্তেম উমেরভ।
তবে বড় ধরনের অগ্রগতির আশা কম।
আলোচনা শুরুর আগেই ইউক্রেন অভিযোগ করে, রাশিয়া রাতভর ২৯টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ৩৯৬টি ড্রোন হামলা চালিয়ে শান্তি প্রচেষ্টা ক্ষুণ্ন করেছে। এতে অন্তত চারজন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়, দক্ষিণাঞ্চলে হাজারো মানুষের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
পূর্বাঞ্চলের স্লোভিয়ানস্ক শহরে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে ড্রোন হামলায় তিন কর্মী নিহত হয়েছেন বলে জানায় ইউক্রেন। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুমি অঞ্চলেও একজন নিহত হন।
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘জেনেভায় নতুন দফা আলোচনার ঠিক আগে ইউক্রেনের ওপর ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা এটাই প্রমাণ করে রাশিয়া শান্তি প্রচেষ্টাকে কতটা উপেক্ষা করছে।’
অন্যদিকে রাশিয়া অভিযোগ করেছে, ইউক্রেনও রাতভর ১৫০টির বেশি ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যার বেশিরভাগ দক্ষিণাঞ্চল ও ২০১৪ সালে দখল করা ক্রিমিয়া উপদ্বীপের ওপর। এতে দক্ষিণ রাশিয়ার একটি তেল ডিপোতে আগুন লাগে।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ সাংবাদিকদের বলেন, আলোচনার প্রথম দিন থেকে বড় কোনো অগ্রগতির খবর প্রত্যাশা করা উচিত নয়।